Forum

Total Page Visits: 128 - Today Page Visits: 1

0 Replies to “Forum”

  1. মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
    ———————
    ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর। সকালে বাবা আমাদের দুই ভাইকে সাথে নিয়ে বাসা থেকে বের হলেন। গন্তব্য গ্রামের বাড়ি। মা এটা-সেটা নিতে গিয়ে বের হতে দেরি করে ফেললেন। মা বাসা থেকে বের হওয়ার মূহুর্তে বাবার সাথে থাকা আমাদের দুই ভাইয়ের এক ভাই ছুটে এসে মাকে বললো, ’বাবাকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে গেছে।’ মা একথা শোনামাত্র বুঝে ফেললেন ঘটনা কি। উনি সঙ্গে সঙ্গে এসডিও সাহেবের বাসায় ছুটে গেলেন। বাবা নওগাঁ শহরে আসার পর থেকে এসডিও সাহেবের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। এসডিও সাহেবও বাবাকে বিশেষ শ্রদ্ধা করতেন। এসডিও সাহেব মা’র কাছে বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা শুনেই বুঝে গিয়েছিলেন বাবাকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে। এসডিও সাহেব মাকে বসিয়ে রেখে গাড়ি নিয়ে সোজা বধ্যভুমিতে গিয়ে হাজির হলেন। বাবাকে ততক্ষণে জল্লাদখানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সামনের ঘরে দুইজন নেতা গোছের বিহারী বসে আলাপ করছিল। এসডিও সাহেব তীব্র ভাষায় জিজ্ঞেস করলেন, ’খান সাহেব কোথায়?’

    তারা প্রথমে একটু থতমত খেয়ে গেলেও নিজেদের সামলে নিয়ে বললো, ‘উসকো তিন বেটা মুক্তিফৌজ হ্যায়, উসকো নেহি ছোড়েঙ্গে। এসডিও সাহেব এবার আরও তীব্র ভাষায় বললেন, ’ঠিক আছে, তোমরা যদি খান সাহেবকে জবাই করতে চাও কর। তবে তার আগে আমাকে জবাই করতে হবে। তার আগে কোনভাবেই খান সাহেবের গায়ে হাত দিতে পারবে না।’ পুরা ঘটনা একেবারে সিনেমার কায়দায় ঘটে গেল। বিহারী দুইজন এসডিও সাহেবের কথায় ভয় পেয়ে ভিতরে ঢুকে গেল। এর কিছুক্ষণ পরে বাবা জল্লাদখানা থেকে বেরিয়ে এলেন। বাবাকে নিয়ে ফেরার সময় পিছন থেকে শুনতে পেলেন, এক বিহারী এসডিও সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলছে, ’সালে মুক্তিফৌজকা বাচ্চা।’ এরপর এসডিও সাহেব বাবা, মা এবং আমাদের দুই ভাইকে একেবারে শহরের বাইরে রেখে তারপর বাসায় ফিরলেন।

    কি ঘটেছিল বধ্যভুমিতে?

    বাবাকে বধ্যভুমিতে নিয়ে যাওয়ার পর তারা প্রকাশ্যে আলাপ করতে থাকলো, যেহেতু এই লোকের তিন ছেলে মুক্তিযোদ্ধা, তাকে কোন অবস্থাতেই ছেড়ে দেয়া যাবে না। বাবাকে মাদারচোদ বলে গালি দিয়ে বলতে থাকলো, ‘তেরা তিন বেটা মুক্তি হ্যায়, না? তো তুমকো ক্যায়ছে ছোড়ুঙ্গে?’ বাবা স্পষ্টতঃই বুঝতে পারছিলেন, তাঁর বেঁচে থাকার আর কোন সম্ভাবনা নাই। তখন তিনি তাদেরকে বললেন, শোন তোমরা, তিন ছেলে নয়, আমার চার ছেলে মুক্তিযোদ্ধা। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, আমাদের তিন ভাই মোটামুটি যুদ্ধের শুরুতেই ভারত চলে যায়। চতুর্থ ভাই আগষ্টের শেষে যুদ্ধে যোগদান করে। এ কারণে রাজাকার, আল-বদররা চতুর্থ ভাইয়ের কথাটা জানতো না। একথা শুনে তারা আরও উত্তেজিত হয়ে পড়লো। বাবাকে একটা কাঠের বেঞ্চের উপর বসিয়ে রাখলো। বাবা ভাবলেন, মারা যখন যাচ্ছিই, তখন একটা সিগারেট টানি। সিগারেট টানতে টানতে বাবা তাদের আলোচনা থেকে বুঝতে পারলেন যে, বিহারীদের জল্লাদ, মানে যে জবাই করে, সেই সালাউদ্দিন বিহারী আরেক বধ্যভুমিতে আছে। সে এলে তারপর বাবাকে জবাই করা হবে। বাবা পরে আমাদের বলেছিলেন, জানিনা, কোথা থেকে এত সাহস এসে আমার উপর ভর করলো। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও আমি খুবই আয়েশ করে সিগারেট টানছিলাম।

    কী অলৌকিকভাবে আমার বাবা বধ্যভূমির জল্লাদখানা থেকে বেঁচে আসলেন। জল্লাদ সালাউদ্দিন বিহারীর আসতে বিলম্ব হচ্ছিলো। আর সেই বিলম্বের সুযোগে এসডিও সাহেব সেখানে গিয়ে হাজির। তাছাড়াও এসডিও সাহেব ঝুঁকি নিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করে বাবাকে যেভাবে বাঁচিয়েছিলেন, সেটা সিনেমার ঘটনাকেও হার মানায়। এসডিও সাহেব এভাবে ঝুঁকি না নিলে তো কিছু করার ছিল না।

    আমাদের পরিবার সারাজীবন এই মহৎপ্রাণ সাহসী মানুষটাকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে যাবে।

    দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জেনেছিলাম, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আল বদর বাহিনী দেশজুড়ে বুদ্ধিজীবি হত্যার যে নীল নকশা তৈরি করেছিল তারই অংশ হিসেবে সেদিন তারা আমাদের বাবাকে বধ্যভূমিতে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। কাকতালীয়ভাবে আমার বাবা ১৯৯৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন। আজ তাঁর ২১তম মৃত্যু বার্ষিকী। সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন।

    (১৯৭১ এ নওগাঁর এসডিও ছিলেন সৈয়দ মারগুব মোরশেদ!! ওনার প্রতি আমাদের পরিবারের কৃতজ্ঞতা আল্লাহ নিশ্চয় পৌঁছে দিবেন।)

    [কেডিয়ান ৭৮ ইতি ভাইয়ের লেখা থেকে]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *